থিসিস লেখার নিয়ম: অধ্যায় সাজানো থেকে রেফারেন্স ও প্লেজিয়ারিজম চেক পর্যন্ত
অনার্স ও মাস্টার্স থিসিসের পাঁচ অধ্যায়ের কাঠামো, সামনের-পেছনের অংশ, রেফারেন্স, Turnitin আর সুপারভাইজারের সাথে কাজ করার নিয়ম।
থিসিস অ্যাসাইনমেন্টের মতো এক সপ্তাহের কাজ নয়। এটা এক সেমিস্টার বা তারও বেশি সময়ের কাজ, যার একটা স্থির কাঠামো আছে, একজন সুপারভাইজার আছেন, আর শেষে একটা ডিফেন্স বা ভাইভা আছে। এই গাইডে থিসিস লেখার নিয়ম ধাপে ধাপে দেওয়া হলো: টপিক বাছাই, প্রপোজাল, অধ্যায় সাজানো, রেফারেন্স, ফরম্যাটিং, প্লেজিয়ারিজম চেক আর জমা দেওয়ার আগের কাজ। অনার্স, মাস্টার্স বা এমফিল, মূল কাঠামো প্রায় একই; তফাত গভীরতায় আর পরিধিতে।
সবার আগে ডিপার্টমেন্টের থিসিস গাইডলাইন বা টেমপ্লেট জোগাড় করুন। ফন্ট, মার্জিন, অধ্যায়ের নাম, রেফারেন্স স্টাইল, শব্দসীমা, সবকিছুতে সেটাই শেষ কথা। নিচের নিয়মগুলো সেই গাইডলাইনের ফাঁকগুলো পূরণের জন্য।
১. টপিক বাছাই ও গবেষণা প্রশ্ন
ভালো থিসিস টপিকের তিনটা লক্ষণ: আপনার আগ্রহ আছে, ডেটা পাওয়া সম্ভব, আর সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়। “বাংলাদেশের অর্থনীতি” টপিক নয়; “২০১৮ থেকে ২০২৩ সালে পাবনা জেলার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের প্রভাব” টপিক। যত নির্দিষ্ট, তত সহজে শেষ হয়।
টপিক থেকে এক থেকে তিনটা গবেষণা প্রশ্ন (research question) বানান। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর যেন ডেটা দিয়ে দেওয়া যায়। “মোবাইল ব্যাংকিং কি ভালো?” প্রশ্ন নয়; “মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারকারী উদ্যোক্তাদের মাসিক বিক্রি অব্যবহারকারীদের থেকে আলাদা কি না” প্রশ্ন।
২. প্রপোজাল: সুপারভাইজারের সাথে প্রথম চুক্তি
বেশিরভাগ ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরুর আগে প্রপোজাল (synopsis) জমা দিতে হয়। এতে থাকে পটভূমি, সমস্যা বিবৃতি, উদ্দেশ্য, গবেষণা প্রশ্ন, সংক্ষিপ্ত সাহিত্য পর্যালোচনা, পদ্ধতি আর সময়সূচি। প্রপোজালে সুপারভাইজারের সই নেওয়ার মানে, পরে “এটা তো বলা ছিল না” শুনতে হবে না। প্রপোজালটা যত্ন করে লিখুন; এর অনেকটা পরে ভূমিকা ও পদ্ধতি অধ্যায়ে সরাসরি কাজে লাগে।
৩. অধ্যায় সাজানো: পাঁচ অধ্যায়ের কাঠামো
সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় ও বিজ্ঞানের বেশিরভাগ থিসিস পাঁচ অধ্যায়ে সাজানো হয়। মানবিকে কাঠামো একটু আলাদা হতে পারে, তবে যুক্তির ক্রম একই।
অধ্যায় ১: ভূমিকা (Introduction)
পটভূমি, সমস্যা বিবৃতি, গবেষণার উদ্দেশ্য ও প্রশ্ন, গুরুত্ব (significance), পরিধি ও সীমাবদ্ধতা, আর থিসিসের বিন্যাস। পাঠক এই অধ্যায় পড়ে বুঝবেন কী খুঁজছেন আর কেন।
অধ্যায় ২: সাহিত্য পর্যালোচনা (Literature Review)
এটা বইয়ের তালিকা নয়, বরং আগের গবেষণাগুলো কী বলেছে, কোথায় একমত, কোথায় দ্বিমত, আর কোন ফাঁকটা (gap) আপনার থিসিস পূরণ করছে, তার সাজানো আলোচনা। থিম ধরে সাজান, লেখক ধরে নয়। প্রতিটা অনুচ্ছেদ শেষে নিজের মন্তব্য রাখুন: এই গবেষণা আপনার প্রশ্নের জন্য কী বোঝায়। AI দিয়ে সাহিত্য পর্যালোচনা সাজানোর সুবিধা ও বিপদ নিয়ে পড়ুন এই লেখায়।
অধ্যায় ৩: পদ্ধতি (Methodology)
গবেষণার ধরন (গুণগত, পরিমাণগত বা মিশ্র), জনসংখ্যা ও নমুনা, নমুনা বাছাইয়ের পদ্ধতি, ডেটা সংগ্রহের উপকরণ (প্রশ্নমালা, সাক্ষাৎকার, সেকেন্ডারি ডেটা), বিশ্লেষণের পদ্ধতি, আর নৈতিক বিবেচনা। এমনভাবে লিখুন যেন অন্য কেউ পড়ে একই গবেষণা আবার করতে পারেন।
অধ্যায় ৪: ফলাফল ও আলোচনা (Results and Discussion)
কিছু ডিপার্টমেন্টে ফলাফল আর আলোচনা দুটো আলাদা অধ্যায়। ফলাফলে শুধু যা পেয়েছেন: টেবিল, চার্ট, পরিসংখ্যান, উদ্ধৃতি। আলোচনায় তার মানে: গবেষণা প্রশ্নের উত্তর কী দাঁড়াল, সাহিত্য পর্যালোচনার সাথে মিলল কি মিলল না, কেন। প্রতিটা টেবিল ও চিত্রে নম্বর, শিরোনাম ও উৎস থাকবে, আর মূল লেখায় তার উল্লেখ থাকবে (“Table 4.2 দেখায় যে...”)।
অধ্যায় ৫: উপসংহার ও সুপারিশ (Conclusion and Recommendations)
মূল ফলাফলের সারসংক্ষেপ, প্রতিটা গবেষণা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক তাৎপর্য, সীমাবদ্ধতা, আর ভবিষ্যৎ গবেষণার দিকনির্দেশ। নতুন তথ্য বা নতুন সাইটেশন এখানে নয়।
৪. সামনের ও পেছনের অংশ
অধ্যায়গুলোর আগে-পরে বেশ কিছু পাতা থাকে, আর এগুলো প্রায়ই শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়োয় হয়:
- শিরোনাম পাতা: থিসিসের নাম, আপনার নাম ও আইডি, ডিগ্রি, ডিপার্টমেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, সুপারভাইজারের নাম, মাস ও বছর
- ঘোষণাপত্র (Declaration): কাজটা আপনার নিজের, অন্য কোথাও জমা দেননি
- সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র
- কৃতজ্ঞতা স্বীকার
- সারসংক্ষেপ (Abstract): ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দে উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, মূল ফলাফল ও উপসংহার; এটা সবার শেষে লিখুন
- সূচিপত্র, টেবিলের তালিকা, চিত্রের তালিকা, সংক্ষেপণের তালিকা
- রেফারেন্স লিস্ট এবং অ্যাপেন্ডিক্স (প্রশ্নমালা, অনুমতিপত্র, কাঁচা ডেটা)
Word-এ হেডিং স্টাইল (Heading 1, 2, 3) ব্যবহার করলে সূচিপত্র এক ক্লিকে তৈরি হয় আর পেজ নম্বর বদলালে নিজে নিজে ঠিক হয়। শুরু থেকে এটা করলে শেষে কয়েক ঘণ্টা বাঁচে।
৫. রেফারেন্স: শুরু থেকেই গুছিয়ে
থিসিসে পঞ্চাশ থেকে দেড়শো রেফারেন্স থাকা স্বাভাবিক। এগুলো হাতে সাজানো প্রায় অসম্ভব। Zotero বা Mendeley-র মতো বিনামূল্যের রেফারেন্স ম্যানেজার প্রথম দিন থেকে ব্যবহার করুন; পড়ার সময় উৎস যোগ করুন, লেখার সময় প্লাগইন দিয়ে সাইটেশন বসান, শেষে এক ক্লিকে রেফারেন্স লিস্ট।
স্টাইল ডিপার্টমেন্ট ঠিক করে দেয়: সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায়ে APA ৭, মানবিকে MLA বা Chicago, প্রকৌশলে IEEE। নিয়ম তিনটা: লেখায় যা সাইট করেছেন তার সবটা লিস্টে থাকবে, লিস্টে যা আছে তার সবটা লেখায় থাকবে, আর পুরো থিসিসে একটাই স্টাইল। ChatGPT বা অন্য AI টুল ব্যবহার করলে তা কীভাবে উল্লেখ করবেন, দেখুন APA ও MLA-তে AI সাইট করার নিয়ম।
৬. প্লেজিয়ারিজম ও Turnitin
বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এখন থিসিস Turnitin-এ চেক করে, আর অনেক ডিপার্টমেন্টে similarity-র একটা সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। সেই সীমা কত, আগেই জেনে নিন। মনে রাখবেন, similarity score আর AI score দুটো আলাদা জিনিস, আর কোনোটাই নিজে নিজে অসদাচরণের প্রমাণ নয়; সেটা মানুষ পড়ে ঠিক করে। দুটো সংখ্যার মানে বিস্তারিত আছে এই লেখায়।
Similarity কমানোর সৎ উপায়: উৎস বন্ধ করে নিজের ভাষায় লেখা, দীর্ঘ উদ্ধৃতি কমানো, আর পদ্ধতি অধ্যায়ের গৎবাঁধা বাক্যগুলো নিজের গবেষণার মতো করে লেখা। শব্দ বদলানোর সফটওয়্যার দিয়ে ঘুরিয়ে লেখা উপায় নয়; তাতে অর্থ নষ্ট হয় আর সুপারভাইজার ধরে ফেলেন।
৭. AI ব্যবহার করলে
থিসিসে AI-র সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বানানো রেফারেন্স। ChatGPT এমন জার্নাল আর্টিকেল সাজিয়ে দিতে পারে যার লেখক আছেন, জার্নাল আছে, কিন্তু আর্টিকেলটা নেই। ডিফেন্সে একজন পরীক্ষক একটা রেফারেন্স খুলে না পেলে পুরো থিসিসের বিশ্বাসযোগ্যতা যায়। তাই AI-র দেওয়া প্রতিটা উৎস Google Scholar-এ খুঁজে নিজে পড়ুন। কীভাবে ধরবেন, দেখুন বানানো AI সাইটেশন ধরার গাইড। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে AI ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়ার নিয়ম থাকলে, ঘোষণাপত্র বা পদ্ধতি অধ্যায়ে সেটা লিখুন।
৮. ফরম্যাটিংয়ের সাধারণ নিয়ম
- Times New Roman ১২, ডাবল বা ১.৫ স্পেসিং; বাংলায় SutonnyMJ বা Nikosh ১৪
- মার্জিন: বাঁ দিকে ১.৫ ইঞ্চি (বাঁধাইয়ের জন্য), বাকি তিন দিকে ১ ইঞ্চি, গাইডলাইন অনুযায়ী
- অধ্যায় নতুন পাতায় শুরু
- সামনের অংশে রোমান পেজ নম্বর (i, ii, iii), অধ্যায় ১ থেকে আরবি (1, 2, 3)
- টেবিল ও চিত্রের নম্বর অধ্যায় ধরে (Table 4.1, Figure 4.2)
- একই শব্দের একই বানান পুরো থিসিসে (organisation না organization, ঠিক করে একটাই)
৯. জমা দেওয়ার আগের চেকলিস্ট
- প্রতিটা গবেষণা প্রশ্নের উত্তর অধ্যায় ৫-এ স্পষ্ট করে আছে?
- Abstract-এ ফলাফল আছে, শুধু উদ্দেশ্য নয়?
- সূচিপত্রের পেজ নম্বর আসল পাতার সাথে মিলছে?
- প্রতিটা টেবিল ও চিত্রের উল্লেখ মূল লেখায় আছে?
- সাইটেশন ও রেফারেন্স লিস্ট পরস্পর মিলছে?
- Similarity রিপোর্ট ডিপার্টমেন্টের সীমার মধ্যে?
- ঘোষণাপত্র ও প্রত্যয়নপত্রে তারিখ ও সই?
- বানান, ব্যাকরণ, tense (পদ্ধতি অতীত কালে, ফলাফলের ব্যাখ্যা বর্তমান কালে) এক বার করে দেখা? সাধারণ ভুলগুলোর তালিকা আছে থিসিস প্রুফরিডিং চেকলিস্টে।
- PDF-এ রূপান্তরের পর ফন্ট ও পেজ ব্রেক ঠিক আছে?
সুপারভাইজারের সাথে কাজ
নিয়মিত দেখা করুন, প্রতিবার আগের বারের মন্তব্যে কী করেছেন তা লিখে নিয়ে যান, আর একসাথে পুরো থিসিস না পাঠিয়ে অধ্যায় ধরে পাঠান। সুপারভাইজারের মন্তব্য বুঝতে অসুবিধা হলে অনুমান করে বদলাবেন না; জিজ্ঞেস করুন।
এডিটিং বা প্রুফরিডিং লাগলে
থিসিস লেখা শেষ হলে অনেকে ভাষা, ফরম্যাটিং আর রেফারেন্স ঠিক করার জন্য বাইরের সাহায্য নেন, আর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রুফরিডিং অনুমোদিত (নিশ্চিত হতে গাইডলাইন দেখুন)। HumanizeBot-এর এডিটররা অধ্যায় ধরে এডিটিং, প্রুফরিডিং, টেমপ্লেট অনুযায়ী ফরম্যাটিং আর APA/MLA/Harvard রেফারেন্স ঠিক করে দেন; সুপারভাইজারের মন্তব্য বুঝতেও সাহায্য করেন। কাজের আগে হোয়াটসঅ্যাপে নির্দিষ্ট দাম, পেমেন্ট বিকাশ, নগদ বা কার্ডে, সাথে PDF রসিদ। বিস্তারিত বাংলা সার্ভিস পেজে বা thesis support পেজে। আমরা আপনার গবেষণা বা লেখা বদলাই না, ভাষা ও উপস্থাপনা ঠিক করি।
সাধারণ প্রশ্ন
থিসিস কত পৃষ্ঠার হয়?
ডিপার্টমেন্টের গাইডলাইনে বলা থাকে। সাধারণভাবে অনার্স থিসিস ৪০ থেকে ৮০ পৃষ্ঠা, মাস্টার্স ৬০ থেকে ১২০ পৃষ্ঠা, রেফারেন্স ও অ্যাপেন্ডিক্স বাদে। পৃষ্ঠা বাড়ানোর চেয়ে প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
থিসিস কোন ক্রমে লিখব?
প্রপোজাল থেকে পদ্ধতি ও সাহিত্য পর্যালোচনার খসড়া আগে, ডেটা পাওয়ার পর ফলাফল ও আলোচনা, তারপর উপসংহার, শেষে ভূমিকা ঠিক করে Abstract। Abstract সবার শেষে।
Similarity কত শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য?
প্রতিষ্ঠান ভেদে আলাদা, তাই নিজের ডিপার্টমেন্টের সীমা জেনে নিন। সংখ্যার চেয়ে জরুরি কোন অংশ মিলছে: রেফারেন্স লিস্ট আর সঠিক উদ্ধৃতি মিললে সমস্যা নয়, সাইটেশন ছাড়া অনুচ্ছেদ মিললে সমস্যা।
থিসিস প্রুফরিডিং করানো কি বৈধ?
বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা ও ফরম্যাটিং ঠিক করানো অনুমোদিত, কিন্তু কনটেন্ট বা বিশ্লেষণ অন্য কাউকে দিয়ে লেখানো নয়। নিজের প্রতিষ্ঠানের নীতি দেখে নিন, আর সন্দেহ থাকলে সুপারভাইজারকে জানান।
Zotero নাকি Mendeley?
দুটোই বিনামূল্যে, দুটোতেই Word প্লাগইন আছে। যেটা আপনার ডিপার্টমেন্টের অন্যরা ব্যবহার করেন সেটা নিন; সমস্যায় পড়লে সাহায্য পাওয়া সহজ হবে।
More from the blog
অ্যাসাইনমেন্ট লেখার নিয়ম: কভার পেজ থেকে রেফারেন্স পর্যন্ত ধাপে ধাপে গাইড
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট কীভাবে সাজাবেন, রেফারেন্স কীভাবে দেবেন, প্লেজিয়ারিজম কোথায...
Turnitin Similarity Score vs AI Score: What Each One Means
Turnitin can show a similarity score and an AI score on the same paper. Here is what each...
থিসিস জমার আগে প্রুফরিডিংয়ের চেকলিস্ট: ১০টা সাধারণ ভুল
থিসিস জমার আগে যে ১০টা ভুল সবচেয়ে বেশি থেকে যায়, আর প্রতিটা কীভাবে নিজেই ধরবেন: সাইটেশন,...